
নিজস্ব প্রতিবেদক :
: প্রফেসর ড. মোঃ আবু তালেব
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক অদৃশ্য কিন্তু গভীর সংকট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে—শ্রেণিকক্ষ ফাঁকা, কিন্তু ফলাফলের খাতা ভরা। ছাত্র-ছাত্রীরা ক্রমশ ক্লাসবিমুখ হয়ে পড়ছে, অথচ পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেয়ে যাচ্ছে। এই বৈপরীত্য শুধু শিক্ষার মানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দক্ষতা, নৈতিকতা ও মানবিক বিকাশকেও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তাই এখনই সময়—শিক্ষার মান বাঁচাতে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে প্রবেশাধিকারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও মানের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রাথমিক স্তরে ভর্তি হার প্রায় শতভাগ হলেও ১০ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৫৭% মৌলিক পড়ার দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। অর্থাৎ, শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে নামমাত্র উপস্থিত থাকলেও প্রকৃত শিক্ষালাভে পিছিয়ে রয়েছে। এই বাস্তবতায় যদি শ্রেণিকক্ষ উপস্থিতিও কমে যায়, তবে শিক্ষার গুণগত অবনতি আরও ত্বরান্বিত হওয়াই স্বাভাবিক। শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্লাসে উপস্থিতি ও শিক্ষার্থীদের ফলাফলের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় তুলনামূলক ভালো ফল করে, আর যারা নিয়মিত অনুপস্থিত থাকে, তাদের ফলাফল দ্রুত অবনতি ঘটে। এমনকি মাত্র ১০% ক্লাস মিস করলেই শিক্ষার্থীর পারফরম্যান্স উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক শিক্ষার্থী ক্লাস না করেও কোচিং বা গাইডনির্ভর পড়াশোনার মাধ্যমে ভালো ফল করছে—যা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকেই বিকৃত করছে।
বাংলাদেশে কোভিড-পরবর্তী সময় থেকে ক্লাসে উপস্থিতির হারও উদ্বেগজনকভাবে কমে গেছে। এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পর প্রথমদিকে উপস্থিতি ৬৭% থাকলেও কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তা কমে ৫৫%-এ নেমে আসে। এই প্রবণতা শুধু সাময়িক নয়; বরং এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্লাসবিমুখতার একটি স্থায়ী সংস্কৃতি তৈরি করছে। অন্যদিকে, উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে অনুপস্থিতির কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—শিক্ষণ পদ্ধতির একঘেয়েমি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর দূরত্ব, কোচিং নির্ভরতা এবং শিথিল উপস্থিতি নীতি এ সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকরা নিজেরাও ক্লাসে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে যথেষ্ট উদ্যোগী নন, যা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে। ফলে শ্রেণিকক্ষ শিক্ষার পরিবর্তে “নোট মুখস্থ” ও “পরীক্ষা পাস” ভিত্তিক একটি বিকৃত শিক্ষা সংস্কৃতি গড়ে উঠছে। এই প্রবণতার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও আচরণগত বিকাশে। শ্রেণিকক্ষ শুধু পাঠ্যবই শেখার জায়গা নয়; এটি সামাজিকীকরণ, শৃঙ্খলা, মূল্যবোধ ও মানবিকতা শেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ক্লাসে অনুপস্থিতির ফলে শিক্ষার্থীরা এই মৌলিক শিক্ষাগুলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়ছে কর্মক্ষেত্রেও—যেখানে দক্ষতা ও আচরণগত সক্ষমতা দুটোই গুরুত্বপূর্ণ।
তাই এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করার নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পাঠদান পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে ক্লাসকে আরও আকর্ষণীয় ও অংশগ্রহণমূলক করতে হবে। তৃতীয়ত, কোচিং নির্ভরতা কমিয়ে শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষাকে প্রাধান্য দিতে হবে। পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে—শুধু নম্বর নয়, প্রকৃত শিক্ষালাভই যেন তাদের সন্তানের মূল লক্ষ্য হয়। সবশেষে বলা যায়, “অটো পাস” বা “সহজে ভালো ফল” কোনো জাতির জন্য টেকসই সমাধান নয়। এটি সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে জাতিকে দক্ষতাহীন করে তোলে। শিক্ষার মান রক্ষা করতে হলে শ্রেণিকক্ষকেই আবার শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ, প্রকৃত শিক্ষা বইয়ের পাতায় নয়—শ্রেণিকক্ষের জীবন্ত বিনিময়েই গড়ে ওঠে।
লেখক: অধ্যাপক, গবেষক ও কলামিস্ট; বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।