
“
কামরুল হাসান জুয়েল
নরসিংদী:
সময়ের প্রবাহে অনেক নাম হারিয়ে যায়, কিন্তু কিছু মানুষ থাকেন—তাদের কর্মে, আদর্শে, মানবিকতায় এবং ভালোবাসার অমলিন স্মৃতিতে। তেমনই এক মহীয়সী নারীর নাম বেগম খোরশেদা বানু—যিনি ছিলেন একাধারে মমতাময়ী জননী, শিক্ষানুরাগী আলোকবর্তিকা, দানবীর সমাজসেবক এবং নীরব মানবতার এক উজ্জ্বল প্রতীক।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানের শ্রদ্ধেয় মা বেগম খোরশেদা বানুর ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আগামী শনিবার (১১ জুলাই) পালিত হবে গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও স্মরণে।
ঐতিহ্য, শিক্ষাবোধ ও মর্যাদার এক আলোকিত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মহীয়সী নারী তৎকালীন ঢাকা জেলার নারায়ণগঞ্জ মহকুমার নরসিংদী থানাধীন আমদিয়া ইউনিয়ন বেলাবো গ্রামের সুপরিচিত ‘ডেপুটি বাড়ি’র সন্তান। তার পিতা মরহুম আবদুল গফুর ছিলেন ব্রিটিশ আমলে এ অঞ্চলের প্রথম ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট—যিনি ‘ডেপুটি সাহেব’ নামে পরিচিত হয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। সেই আলোকিত বংশধারার উত্তরসূরি খোরশেদা বানুও ছোটবেলা থেকেই ছিলেন ব্যতিক্রমী—মেধাবী, বিনয়ী, মিষ্টভাষী এবং মানবপ্রেমে উজ্জ্বল।
আট ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয় এবং বোনদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ এই নারী শিক্ষাজীবনে ছিলেন অনন্য। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ইডেন স্কুলে অধ্যয়নকালেই তার জ্ঞানপিপাসা ও সাহিত্যপ্রেমের পরিচয় মেলে। বই ছিল তার নিত্যসঙ্গী—জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি বিশ্বসাহিত্য, নোবেলজয়ী মনীষীদের রচনা এবং জ্ঞানের নানা শাখায় নিজেকে নিমগ্ন রেখেছেন। তার এই জ্ঞানচর্চা তাকে গড়ে তুলেছিল এক প্রজ্ঞাময়, সুদূরপ্রসারী চিন্তার মানুষ হিসেবে।
তার পারিবারিক পরিমণ্ডলও ছিল কৃতিত্বে ভরপুর। তিনি ছিলেন ডাক ও তার বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক জনাব নাসিরউদ্দিন আহমদের ছোট বোন এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধা প্রফেসর গিয়াসউদ্দিন আহমদসহ একাধিক প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীর জ্যেষ্ঠা বোন। এই পরিবার যেন জ্ঞানের এক জীবন্ত বাতিঘর—যেখান থেকে আলোকিত হয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
১৯৪২ সালে তিনি আবদুল মোমেন খানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন—যিনি পরবর্তীতে দেশের কেবিনেট সচিব ও সফল খাদ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দাম্পত্য জীবনে খোরশেদা বানু ছিলেন এক আদর্শ সহধর্মিণী—সংসার, সমাজ ও মানবতার মধ্যে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক অনন্য ভারসাম্য।
তিনি ছিলেন এক রত্নগর্ভা জননী—যার সন্তানদের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়েছে তার শিক্ষা, মূল্যবোধ ও আদর্শ। তার পুত্র ড. আবদুল মঈন খান দেশের একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী হিসেবে সুপরিচিত। অন্যদিকে তার দুই কন্যা ফৌজিয়া বেগম ও ড. সেলিমা বেগম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা পেশায় নিয়োজিত থেকে দেশের শিক্ষা অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করেছেন এবং বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরিসরে কর্মরত। এ যেন এক মায়ের গড়ে তোলা আলোকিত উত্তরাধিকার।
কিন্তু খোরশেদা বানুর জীবন কেবল পরিবারেই সীমাবদ্ধ ছিল না—তিনি ছিলেন সমাজের জন্য নিবেদিত প্রাণ। ১৯৮৮ সালের প্রলয়ংকরী বন্যায় যখন অসহায় মানুষ দিশেহারা, তখন তিনি মানবতার হাত বাড়িয়ে দেন। তারই উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘খান ফাউন্ডেশন’, যা পরবর্তীতে শিক্ষা ও মানবকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই ফাউন্ডেশনের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত ‘দি মিলেনিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়’ আজ জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে চলেছে।
নিজের ব্যক্তিগত সম্পদকেও তিনি মানবকল্যাণে উৎসর্গ করেছেন—মোমেনবাগে অবস্থিত তার নিজস্ব আবাসস্থল তিনি খান ফাউন্ডেশন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবহারের জন্য চিরতরে দান করে গেছেন। এমন নিঃস্বার্থ দানের দৃষ্টান্ত সমাজে বিরল।
নিজ গ্রাম বেলাবোতেও তিনি রেখে গেছেন উন্নয়নের অমলিন ছাপ। শহীদ বুদ্ধিজীবী ভ্রাতা গিয়াসউদ্দিন গার্লস হাই স্কুলের উন্নয়নে জমি দান করে তিনি শিক্ষা বিস্তারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
শিল্পভাবনাতেও তিনি ছিলেন অনন্য—সূচিশিল্পে তার নিপুণতা ছিল প্রশংসনীয়। তার সৃষ্টির ছোঁয়ায় যেমন ফুটে উঠত সৌন্দর্য, তেমনি তার জীবনও ছিল নান্দনিকতা ও মানবিকতার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ।
মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে শনিবার বিকেল ৩টায় নরসিংদীর সদর উপজেলার আমদিয়া ইউনিয়ন পাকুরিয়া বাজার সংলগ্ন পাইকারদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে এক আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এতে অংশ নেবেন স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সর্বস্তরের মানুষ।
আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই—তবুও তার আদর্শ, মানবতা, দানশীলতা ও ভালোবাসা ছড়িয়ে আছে মানুষের হৃদয়ে, প্রতিষ্ঠানে, এবং প্রতিটি সৎকর্মে।
বেগম খোরশেদা বানু—একটি নাম নয়, একটি প্রেরণা; একটি জীবন নয়, এক আলোকিত উত্তরাধিকার।