
কামরুল হাসান জুয়েল,
নরসিংদী জেলা প্রতিনিধি।
নরসিংদীর মাধবদী থানার শেখার চর বাবুরহাট এলাকার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদী এখন দখল ও দূষণের ভয়াবহ কবলে পড়ে মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছে। এক সময়ের প্রশস্ত ও প্রাণবন্ত এই নদী আজ শিল্পকারখানার বর্জ্য আর অবৈধ দখলের চাপে হারাতে বসেছে তার স্বাভাবিক প্রবাহ ও অস্তিত্ব।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আশপাশের বিভিন্ন ডাইং কারখানার রঙিন ও রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। ফলে নদীর পানি কালো কুচকুচে হয়ে গেছে এবং পানির ওপর জমেছে তেলের আস্তরণ। পানিতে হাত দিলেই তীব্র রাসায়নিক গন্ধ উঠে আসে, যা পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। নদীতে এখন আর মাছসহ কোনো প্রাণের অস্তিত্ব চোখে পড়ে না।
নদীর বুকজুড়ে ভাসছে পলিথিন ও বিভিন্ন বর্জ্যের স্তূপ। অনেক জায়গায় নদী ভরাট হয়ে সরু খালে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, শীলমান্দি ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের আকাব্বর মেম্বার তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের পেছনে নদীর জায়গা দখল করে ভরাট করেছেন। যদিও তিনি প্রথমে অভিযোগ অস্বীকার করেন, পরে বিষয়টি ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত আরেক ব্যক্তি সালাম শিকদার দাবি করেন, তারা বৈধভাবে ৪৯ ডিসিমেল জমি ক্রয় করেছেন। তার ভাষ্য, “যদি মাপজোখে নদীর জায়গা পড়ে, তাহলে আমি আমার বিল্ডিং ভেঙে দেব।” তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে তিনি অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।
নদী দখল ও দূষণ নিয়ে শেখার চর বাবুরহাট বাজার বণিক সমিতির সভাপতি বোরহান উদ্দিন বলেন, “ডাইং বর্জ্য ও পলিথিন ফেলে নদী ভরাট করা হচ্ছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী হোটেলের পেছনে জায়গা বাড়িয়ে নদী দখল করছে। আমরা চেষ্টা করেও এটি বন্ধ করতে পারছি না। প্রশাসনের সহযোগিতা প্রয়োজন।”
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী হুমায়ুন কবির জানান, “বিষয়টি আমরা অবগত আছি। এর আগে সেনাবাহিনী নদী দখলমুক্ত করেছিল। কিন্তু আবার কিছু লোক দখলের চেষ্টা করছে। দ্রুত এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে কুড়েরপার এলাকায় অবস্থিত ‘কনফিডেন্স ডাইং’ নামের একটি কারখানার বিরুদ্ধে পরিবেশগত বৈধ কাগজপত্র না থাকার অভিযোগ উঠেছে। তথ্য সংগ্রহে গেলে প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার রুবেল সাংবাদিকদের টাকা দিয়ে ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া কারখানা মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বদরুল হুদা বলেন, “নদীর অবস্থা দেখলে কষ্ট লাগে। আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি এবং কয়েকটি ডাইং কারখানাকে জরিমানা করা হয়েছে। তবে প্রশাসন ও চেম্বার অব কমার্সের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।”
স্থানীয়দের মতে, এক সময় যে নদীতে নৌকা চলাচল করত, এখন সেখানে মানুষ হেঁটে চলাচল করছে। নদীটি এখন শিশুদের খেলার মাঠে পরিণত হয়েছে। নদী হারিয়ে যাওয়ায় জীবিকার পথ হারিয়েছেন স্থানীয় জেলেরা। দুর্গন্ধে আশপাশের মানুষের বসবাসও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে অবৈধ দখল এবং অন্যদিকে শিল্পকারখানার অবাধ দূষণ—এই দ্বিমুখী চাপে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদী অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। দ্রুত কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে অচিরেই হারিয়ে যেতে পারে এই ঐতিহ্যবাহী নদীটি।
নদী রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যথায়, চোখের সামনে একটি নদীর মৃত্যু দেখেও দায় এড়ানোর সুযোগ আর থাকবে না।