
গাজীপুর প্রতিনিধি : গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের খিলগাঁও-পুবাইল এলাকায় ‘এম্পায়ার গ্রুপ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনুমোদনহীন আবাসন প্রকল্পের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি অনুমোদন ছাড়াই আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে স্বল্প আয়ের মানুষকে প্লট বিক্রির প্রলোভন দেখানো হচ্ছে।
সাইনবোর্ড ঘিরে বিভ্রান্তি
এলাকাবাসীর অভিযোগ, মাসিক দুই হাজার টাকা কিংবা বার্ষিক ১০ হাজার টাকায় কৃষিজমি ভাড়া নিয়ে সেখানে বড় আকারের সাইনবোর্ড বসানো হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে যে আশপাশের বিশাল এলাকা কোম্পানির মালিকানাধীন। ফলে স্থানীয় জমি কেনাবেচায় স্থবিরতা দেখা দিয়েছে এবং প্রকৃত জমির মালিকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
স্থানীয় জমির মালিক সাইফুল ইসলাম জানান, মাসিক দুই হাজার টাকায় তার জমিতে সাইনবোর্ড বসানো হলেও দুই মাস পর থেকে আর ভাড়া দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, “প্রথমে ভেবেছিলাম সাময়িকভাবে বোর্ড দেবে। এখন সেটি সরাচ্ছে না, ভাড়াও দিচ্ছে না।”
অন্যদিকে, কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত রুস্তম আলী নামের এক ব্যক্তি দাবি করেন, এই মৌজায় ১৫ থেকে ২০ বিঘা জমি কোম্পানি সরাসরি গ্রাহকের নামে রেজিস্ট্রি করে দিয়েছে। তবে তার দাবির পক্ষে কোনো কাগজপত্র বা অনুমোদনের প্রমাণ দেখানো হয়নি।
অনুমোদনের তথ্য নেই
Gazipur City Corporation-এর প্রধান নগর পরিকল্পনা কর্মকর্তা ড. সৈয়দা সায়ফা বিনতে আলম জানান, ‘এম্পায়ার গ্রুপ’ নামে কোনো আবাসন প্রকল্পের অনুমোদন তাদের কাছ থেকে নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, “এই নামে কোনো কোম্পানির বিষয়ে আজ আপনার কাছ থেকেই জানলাম। সিটি কর্পোরেশনের একটি মাস্টার প্ল্যান রয়েছে, যা গাউকের সঙ্গে সমন্বয় করে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বলেন, অনুমোদন ছাড়া কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া বেআইনি। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ড্যাপের বাইরে প্রকল্প হলে বেআইনি
রাজউকের আওতাধীন ডিটেইলস এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) প্রসঙ্গে GAUK-এর চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, উন্মুক্ত জলাশয় বা কৃষিজমি যদি ড্যাপের অনুমোদনের বাইরে থাকে, সেখানে আবাসন প্রকল্পের নামে জমি ক্রয়-বিক্রয় করা যায় না। অনুমতি ছাড়া এ ধরনের কার্যক্রম ক্রেতা-বিক্রেতার সঙ্গে প্রতারণার শামিল হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
আবাসন খাতের সংগঠন BLDA জানিয়েছে, ‘এম্পায়ার গ্রুপ’ তাদের তালিকাভুক্ত কোনো সদস্য নয়।
পরিবেশবিদ ও সিনিয়র সাংবাদিক কালিমুল্লাহ ইকবাল বলেন, অনুমোদন ছাড়া জমি বিক্রির নামে প্রতারণা পুরো আবাসন খাতের জন্য হুমকি এবং এতে সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হয়।
দুদকের এক কর্মকর্তা জানান, লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করা হবে।
হাইকোর্টের আইনজীবী আবুল কালাম আজাদ বলেন, অনুমোদনহীন যৌথ বিনিয়োগ বা প্লট বিক্রয় কার্যক্রম ভুয়া হিসেবে গণ্য হতে পারে এবং প্রতারণার দায়ে রাষ্ট্র মামলা করতে পারে।
কোম্পানির বক্তব্য মেলেনি
কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জুয়েলের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। বিজ্ঞাপন বিভাগে দেওয়া নম্বরেও ফোন রিসিভ করা হয়নি।
কোম্পানির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এক বিজ্ঞাপনে দাবি করা হয়েছে, তারা Jabbar Tower-এ অবস্থিত কর্পোরেট অফিস থেকে পরিকল্পিত প্লট বিক্রি করছে এবং নিরাপদ বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ে প্রকল্পের অনুমোদন ও বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা
স্থানীয়রা বলছেন, দ্রুত তদন্ত করে প্রকল্পের বৈধতা যাচাই করা জরুরি। অনুমোদনহীন প্রকল্পের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হলে তা রোধে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। খিলগাঁও-পুবাইল এলাকার বাসিন্দারা এখন সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগের অপেক্ষায় রয়েছেন।