
: প্রফেসর ড. মোঃ আবু তালেব
বাংলাদেশ আজ এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে উন্নয়নের অগ্রযাত্রা, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ, বনভূমি হ্রাস, জীববৈচিত্র্যের সংকট এবং ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা আমাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল—সর্বত্রই প্রকৃতির ভারসাম্যহীনতার প্রভাব দৃশ্যমান। গ্রীষ্মের দাবদাহ প্রতি বছর আরও তীব্র হচ্ছে, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কৃষিকে বিপর্যস্ত করছে, নদীভাঙনে নিঃস্ব হচ্ছে হাজার হাজার পরিবার, আর উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তার মানুষের জীবন ও জীবিকাকে কঠিন করে তুলছে। এমন বাস্তবতায় বৃক্ষরোপণ আর নিছক একটি সরকারি কর্মসূচি নয়; এটি জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার অপরিহার্য প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন এখন মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এবং বন উজাড়ের ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এর ফলেই পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এই শতাব্দীর মধ্যেই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যা মানবজীবন, কৃষি, পানি ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। অথচ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান অত্যন্ত সামান্য। তবুও ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, নদীভাঙন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো সমস্যার কারণে দেশের লাখো মানুষ প্রতি বছর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজন ও প্রশমন—দুই ক্ষেত্রেই বৃক্ষরোপণ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
গাছকে বলা হয় পৃথিবীর প্রাকৃতিক ফুসফুস। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ বছরে গড়ে ২০ থেকে ২৫ কেজি পর্যন্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে পারে এবং মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহ করে। শুধু তাই নয়, গাছ বায়ুদূষণ কমায়, মাটির উর্বরতা রক্ষা করে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে এবং স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যে কারণে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বৃক্ষরোপণকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সহজ, কার্যকর এবং কম ব্যয়বহুল অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করেন।
বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগজনকভাবে কম। সরকারি হিসাব অনুযায়ী দেশের মোট ভূমির প্রায় ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ বনাঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত হলেও কার্যকর বনভূমির পরিমাণ আরও কম বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। অথচ আন্তর্জাতিকভাবে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য মোট ভূমির অন্তত ২৫ শতাংশ বনাঞ্চল থাকা প্রয়োজন বলে ধরা হয়। এই বাস্তবতায় বৃহৎ পরিসরে বৃক্ষরোপণ ছাড়া পরিবেশগত ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই।
এ কারণেই পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের জাতীয় কর্মসূচি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সরকারের উদ্যোগে ইতোমধ্যে দেশের ৪৯টি জেলার ১৪৯টি উপজেলায় প্রথম ধাপে দেড় কোটি চারা রোপণের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বনজ, ফলদ ও ঔষধি—এই তিন ধরনের দেশীয় গাছকে অগ্রাধিকার দিয়ে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এটি একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। কারণ দেশীয় প্রজাতির গাছ স্থানীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত সুবিধাও বেশি প্রদান করে।
বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব শুধু পরিবেশগত নয়; এর অর্থনৈতিক তাৎপর্যও ব্যাপক। ফলদ গাছ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে, কৃষকের অতিরিক্ত আয়ের উৎস তৈরি করে এবং পুষ্টি চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখে। বনজ গাছ কাঠ ও অন্যান্য বনজ সম্পদের চাহিদা পূরণ করে। ঔষধি গাছ স্থানীয়ভাবে স্বাস্থ্যসেবার বিকল্প উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে। একই সঙ্গে নার্সারি শিল্প, চারা উৎপাদন, পরিবহন ও পরিচর্যা কার্যক্রমের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ বৃক্ষরোপণ পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও একটি কার্যকর মাধ্যম।
বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো উপকূলীয় বনায়ন। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, সুন্দরবনের মতো ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা প্রাচীর হিসেবে কাজ করে। ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা কিংবা আম্পানের সময় সুন্দরবন বহু অঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফলে উপকূলীয় এলাকায় নতুন ম্যানগ্রোভ বনায়ন শুধু পরিবেশ সংরক্ষণ নয়; এটি দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসেরও কার্যকর উপায়।
তবে বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে—গাছ লাগানোর চেয়ে গাছ বাঁচানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে বিভিন্ন সময়ে লক্ষ লক্ষ চারা রোপণ করা হলেও পর্যাপ্ত পরিচর্যার অভাবে তার একটি বড় অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে শুধু সংখ্যার হিসাব দিয়ে সফলতা মাপা যাবে না। কতগুলো চারা পরিণত বৃক্ষে রূপান্তরিত হলো, সেটিই হবে প্রকৃত সাফল্যের মানদণ্ড। এজন্য দীর্ঘমেয়াদি তদারকি, স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
এখানে গণমানুষের অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। সরকার একা কখনোই ২৫ কোটি গাছ রোপণ ও সংরক্ষণের বিশাল দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। প্রতিটি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সরকারকে এই উদ্যোগের অংশ হতে হবে। বিদ্যালয় পর্যায়ে “এক শিশু, এক গাছ” কর্মসূচি তাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শিশুকাল থেকেই পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে পারলে ভবিষ্যতে একটি পরিবেশ-সচেতন প্রজন্ম তৈরি হবে।
বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর ভূমিকাও এ ক্ষেত্রে প্রশংসনীয়। ‘মিশন গ্রিন বাংলাদেশ’, ‘মাস্তুল ফাউন্ডেশন’, ‘বন্ধু ফাউন্ডেশন’-সহ বিভিন্ন সংগঠন দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ এবং পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। সরকারি উদ্যোগের সঙ্গে এসব সংগঠনের সমন্বয় ঘটানো গেলে বৃক্ষরোপণ আন্দোলন আরও বিস্তৃত ও কার্যকর হবে।
বর্তমান বিশ্বে উন্নয়নের ধারণাও বদলে গেছে। এখন শুধু অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই উন্নয়নের একমাত্র সূচক নয়; পরিবেশগত স্থায়িত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যে উন্নয়ন প্রকৃতি ধ্বংস করে, তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না। তাই বৃক্ষরোপণকে উন্নয়ন পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে। প্রতিটি নতুন সড়ক, শিল্পাঞ্চল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা আবাসন প্রকল্পের সঙ্গে সমন্বিত বনায়ন কার্যক্রম নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
আজকের পৃথিবীতে একটি গাছ শুধু একটি গাছ নয়। এটি কার্বন শোষণকারী একটি জীবন্ত যন্ত্র, এটি একটি ক্ষুদ্র বাস্তুতন্ত্র, এটি পাখির আশ্রয়স্থল, এটি মাটির রক্ষক, এটি বায়ু পরিশোধক এবং সর্বোপরি এটি মানুষের জীবনরক্ষাকারী বন্ধু। তাই বৃক্ষরোপণকে আনুষ্ঠানিকতা, ছবি তোলা বা মৌসুমি কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এটিকে জাতীয় সংস্কৃতি, সামাজিক আন্দোলন এবং নাগরিক দায়িত্বে পরিণত করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আজ একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। আমরা চাইলে উদাসীন থাকতে পারি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও অনিরাপদ পরিবেশ উপহার দিতে পারি। আবার চাইলে আজ থেকেই ব্যাপক বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে একটি সবুজ, নিরাপদ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারি। সুতরাং বৃক্ষরোপণ কোনো সাময়িক কর্মসূচি নয়, কোনো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির সীমাবদ্ধ বিষয়ও নয়; এটি জাতীয় প্রয়োজন, জাতীয় দায়িত্ব এবং জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম প্রধান উপায়। আজ একটি গাছ রোপণ মানে শুধু একটি চারা মাটিতে পোঁতা নয়; বরং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যতের বীজ বপন করা।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট এবং অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।