
নিজস্ব প্রতিবেদক:
শিল্প-শ্রমিক অধ্যুষিত গাজীপুর নগরীতে দিন দিন মশার যন্ত্রণা যেন বেড়েই চলছে। গাজীপুরের বাসিন্দারা যেন মশার কাছে অসহায়, জিম্মি। রাতে তো বটেই; দিনেও চলছে মশার অত্যাচার। মশারি টানিয়ে, কয়েল জ্বালিয়ে, ইলেকট্রিক ব্যাট কিংবা মশানাশক ওষুধ স্প্রে করেও সুফল মিলছে না। বিকেল থেকে শুরু হয়, সন্ধ্যার আজান পড়লেই মশার উৎপাত তীব্র আকার ধারণ করে। বিভিন্ন এলাকার ড্রেন, পুকুর, ডোবা, নালা-নর্দমার কচুরিপানা ও ময়লা পরিষ্কার না করায় সেগুলো এখন মশা উৎপাদনের খামারে পরিণত হয়েছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার নগরীতে মশার উপদ্রব অনেকটাই বেশি। ঘরে বাইরে বাসা কিংবা অফিসসহ সব জায়গায় মশা। কিন্তু মশক নিধন কর্মীদের মাঠে হঠাৎ দেখা যায়।
সরজমিনে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা ঘুরে জানা যায়, দিন-রাতে মশার কামড়ে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে নগরবাসী। বেড়েছে মশার দৌরাত্ম্য। এতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে মানুষ। বাসাবাড়ি, দোকানপাট, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত সর্বত্রই মশার উপদ্রব। সেটা চলছে দিন-রাতে সমানতালে। দিন-রাতে কয়েল জ্বালিয়ে, ওষুধ ছিটিয়ে, মশারি টাঙিয়েও যেন নিস্তার পাওয়া যাচ্ছে না। এর মধ্যে গাজীপুরবাসীর মধ্যে বিরাজ করছে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার আতঙ্ক। বিশেষ করে গভীর রাতে মশার অত্যাচার কয়েকগুণ বেড়ে যায়। মশার অত্যাচারে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া, দোকানপাট, অফিস-আদালত, মসজিদ-মাদ্রাসাসহ সব জায়গায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। মশার যন্ত্রণায় দিনের বেলায় বেশির ভাগ বাসা-বাড়িতে মশারি টাঙিয়ে রেখেছে। আবার কেউ কেউ দিনেও ঘর-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে মশার কয়েল কিংবা ধুপ জ্বালিয়ে রাখছে।
গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল: গাজীপুর শহীদ তাজ উদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিচ তলা থেকে শুরু করে ১৩ তলা পর্যন্ত দেখা যায় মশার উপদ্রব। হাসপাতালের চারদিকেই রয়েছে ময়লা আবর্জনার স্তুপ, ড্রেন ও নর্দমা। সেখান থেকে দুর্গন্ধ ছাড়াচ্ছে। পরিষ্কার না করায় এসব ড্রেন ও নর্দমা মশার আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, হাসপাতালের আশেপাশে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা খাবারের উচ্ছিষ্ট, আর্বজনা, গজ-তুলা ও ব্যান্ডেজ পচে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। আর জমে থাকা গজ-তুলা ও ব্যান্ডেজে গিজগিজ করছে মশা।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শীত তেমন না পড়লেও মশার উপদ্রব বেড়েছে বহুগুণ। মশার কামড়ে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকনগুনিয়া, গাদসহ নানা রোগে আক্রান্ত হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। সামনে বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে। তাই মশা নিধনের জন্য গাজীপুর সিটি করপোরেশনকে এখন থেকেই ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে বড় ধরনের কোনো সংকট তৈরি না হয়।
নগরীর স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মশা নিধনের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীরবতায় মশারা যেন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আধুনিক গাজীপুর নগরী গড়ার প্রতিশ্রুতি যেন শুধু আশ্বাসেই আটকে আছে। মশার উপদ্রব এখন নগরবাসীর জন্য ‘গোদের উপর বিষফোড়া’ হয়ে দেখা দিয়েছে। জলাশয়গুলো মশার প্রজননের নিরাপদ ও উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এলাকাবাসী দিনে যেমন মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ, তেমনি সন্ধ্যার পর পুরো নগরী মশার অভয়াশ্রমে পরিণত হয়।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (যুগ্ম সচিব) মুহাম্মদ সোহেল হাসান বলেন, ওষুধের কোন ঘাটতি নেই, লোকবল সংকট। ‘নাগরিকদের সকল সমস্যার বিষয়ে আমরা সচেতন। বিভিন্ন সময়ে নাগরিকদের সমস্য নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, নানা উন্নয়ন পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হচ্ছে। মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে মশার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। মশকনিধনে নাগরিকদের আরও সচেতন করতে কাজ চলছে।’
সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, মহানগরীর ৫৭টি ওয়ার্ডে মশক নিধনের জন্য ২৪০টি হ্যান্ড স্প্রে মেশিন, জামার্নের তৈরি উন্নত প্রযুক্তির ৫৫টি ফগার মেশিন, আমেরিকার তৈরি ৫টি ফগার মেশিন, কোরিয়ানের উন্নত প্রযুক্তির ৮০টি ফগার মেশিন, রয়েছে ভেহিক্যাল মাউন্টেড ফগার মেশিন। পাশাপাশি মশা মারার ওষুধ ছিটানো, বিভিন্ন জলাশয়, নর্দমা ও ডোবা পরিষ্কার করা এসব দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। প্রতিবারই আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার উপস্থিতিতে নগরীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের, বাজারের ব্যবসায়ীদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভা, মাইকিং, লিফলেট বিতরণ, নর্দমা ও বর্জ্য পরিষ্কার, এডিস মশার প্রজনন স্থল পরিদর্শন, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ৩টি নগর মাতৃসদন, ৭ টি নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্র সহ ১১ টি প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে ডেঙ্গু রোগের পরীক্ষা ও চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়।
সূত্র আরো জানায়, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে নগরবাসীর সুরক্ষায় মশার ঔষধ সংগ্রহ করার জন্য দরপত্র আহ্বান করে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ। টেন্ডার আইডি নং- ৮৯০১১৫, যা প্রাক্কালিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। নিজস্ব অর্থায়নে ডেঙ্গু চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে ৫ কোটি ৩৯ লাখ ৫ হাজার টাকার মশক নিধন ওষুধ ক্রয় করেন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন।
আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তারা বলছেন : সিটির ৮টি অঞ্চলের ৫৭টি ওয়ার্ডে আমাদের কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে একটি ওয়ার্ডে ছয়জন কর্মী মশার ওষুধ ছিটানোর কাজে নিয়োজিত থাকে। শুক্রবারসহ সপ্তাহে সাত দিন মশকনিধন কার্যক্রম অব্যাহত থাকে। মশার ওষুধ ছিটালেই মশা কমে না। মশক নিধনে আমাদের পক্ষ থেকে সর্Ÿোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি। প্রত্যোক এলাকাবাসীর সহযোগিতা ও সচেতনতা দরকার। সুযোগ পেলেই তারা বাড়ির ময়লা আবর্জনা রাস্তায় বা ড্রেনে ফেলে দিয়ে যায়। এতে করে মশা বৃদ্ধি পায় আর পরিবেশ ও দূষিত হয়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ: মহানগরের ২৫ নং ওয়ার্ড এলাকার বাসিন্দা শহীদুল ইসলাম বলেন, অত্র এলাকায় কোন ফগিং স্প্রে মেশিনের মশক নিধন কর্মী দেখিনি। কাজ না করেই সরকারি বেতন ঠিকই খাচ্ছে। আর মশার অতিষ্ঠে আমরা ঘরে বাইরে থাকতে পারছি না।
টঙ্গী বউ বাজারের স্থানীয় ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন বলেন, মশার যন্ত্রণায় দিন-রাত অসহনীয় অবস্থায় রয়েছি। দিনের বেলাও মশার উপদ্রব থাকে, বিকেলে তা বেড়ে যায় বহুগুণ। অথচ এমন পরিস্থিতিতে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে তেমন কোন মশার ওষুধ প্রয়োগ করতে দেখছি না।
এছাড়াও টঙ্গী, গাজীপুরা, বোর্ডবাজার, জয়দেবপুর, কোনাবাড়ী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সব জায়গাতেই মশার উপদ্রব বেড়েছে। অনেকেই ফ্ল্যাটের জানালায় নেট ব্যবহার করা সত্ত্বেও মশার অত্যাচার থেকে রেহাই পাচ্ছে না। নিচতলা থেকে শুরু করে ১০ তলা পর্যন্ত সবখানেই মশার সমান উপদ্রব।
তালুকদার পাড়া এলাকার মুদিদোকানদার হযরত আলী জানান, গত কয়েক মাস ধরে আমাদের এলাকায় সিটি করপোরেশন মশকনিধনের কাজ কর্ম নেই বললেই চলে। ড্রেন ও রাস্তাঘাটগুলো পরিষ্কার করা হয় না। ড্রেন বন্ধ হয়ে যত্রতত্র ময়লা জমে আছে। নিয়মিত মশার ওষুধও ছিটানো হয় না। প্রতিবছর এই এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি থাকে তারপরও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বড় অফিসাররা এদিকে নজর দেন না।
নগরীর ২৮ নং ওয়ার্ড স্থানীয় বাসিন্দা সবুজ বলেন, আমাদের কাছে দিনরাত সমান। মশার যন্ত্রণা ঘরে বাইরে কোথায়ও শান্তি নেই। মশার কয়েল কিংবা ধুপ জালিয়ে ও নিস্তার পাওয়া যায় না। মশক নিধন কর্মীরা সপ্তাহে দুই একবার এসে নাম মাত্র ওষুধ ছিটিয়ে যায়। মেশিনে আদৌও মশা মরার ওষুধ আছে? নাকি লোক দেখানো বুঝি নাকি, কারণ মশা তো কমে না।
মহানগরের ৫১ নং ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাক আহমেদ হারুন বলেন, ‘মশা আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। মশার যন্ত্রণায় ঘরের দরজা-জানালা খোলা রাখা যায় না। বাচ্চারা পড়তে বসে মশার কামড়ে অস্থির হয়ে যায়। দিনের বেলায়ও কয়েল জ্বালিয়ে রাখতে হয়। সন্ধ্যার পর ঘরে থাকা যায় না। যেখানে বসি সেখানেই মশা কামড়ায়, মশার কামড়ে শরীর লালচে হয়ে যায়।’
চান্দনা চৌরাস্তার ফার্নিচার ব্যবসায়ী রুবেল মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের এলাকায় অনেক মশা। মশার ওষুধ ছিটানো হয় দেখছি, কিন্তু আমাদের এলাকায় দেয় না। রাত-দিন মশার কামড়ে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি।
বোর্ডবাজার বাদে কলেম্বেশর এলাকার গৃহিণী সালেহা বেগম বলেন, ‘আমাদের এখানে মশার ওষুধ ছিটাতে তেমন দেখা যায় না। একদিন দিলে সাত দিন কোন খবর থাকে না। কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করব, যেন দ্রুত আমাদের এলাকায় মশার ওষুধ ছিটানো হয়। মশা অনেক বেড়ে গেছে। দিনে ঘুমাতে গেলে বা সন্ধ্যার পর থেকে মশারি টাঙিয়ে রাখতে হয়। মশার সমস্যা খুবই জটিল হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেকদের মতামত: বিশ্লেকরা বলছেন বিভিন্ন এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা খুবই নাজুক। দেখে মনে হচ্ছে, গত কয়েক মাস ড্রেনেজের ময়লা পরিষ্কার করা হয়নি। বাসাবাড়ী ও এলাকার স্থানীয় বাজারের সব উচ্ছিষ্ট ময়লা আবর্জনা সব ড্রেনের মধ্যে ফেলানো হচ্ছে ফলে ড্রেনেজ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে। আর সেই বদ্ধ পানিতে মশার প্রজনন বৃদ্ধি ও উপদ্রব বাড়ছে। অন্যদিকে মশার ওষুধ ক্রয়, সংরক্ষণ, ব্যবহারে স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ওষুধ ছিটানোর কাজে নিয়োজিত জনবলকে মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে।
মশা প্রজনন মৌসুম, প্রজননক্ষেত্র চিহ্নিতপূর্বক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, লার্ভা ধ্বংস উপযোগী ওষুধ ছিটানো, ড্রেনসহ যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।